ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ২৭/০৮/২০২২ ৬:৫৫ এএম

ডলফিন জলজ পরিবেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। যে নদীতে ডলফিন থাকে সেই নদীতে মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং নদীর পরিবেশ সুস্থ থাকে। এদের উপস্থিতি পানির গুণগত মান বা অবস্থা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। পরিবেশগত প্রভাব বোঝার নির্দেশক এই শুশুকগুলো বর্তমানে ভালো নেই। বাংলাদেশে এরা বিপন্ন প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত। পৃথিবীজুড়ে এদের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। অপরিকল্পিত বাঁধ তৈরি, মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, নির্বিচারে হত্যা, মাছ ধরার জালে আটকে পড়ে মৃত্যু এদের সংখ্যা হ্রাসের অন্যতম কারণ।
গত মঙ্গলবার সকাল ১১ টার দিকে উখিয়ার পাটুয়ার টেক বাইলাখালী সমুদ্র সৈকতে স্থানীয়রা একটি ডলফিন দেখতে পায়। খবর পেয়ে বীচ কর্মীরা ও স্থানীয়রা ডলফিনটিকে কয়েকবার সাগরজলে ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেও বারবার কুলে ফিরে আসে ২৮ কেজি ওজনের ডলফিনটি। ৪ ঘন্টা জীবিত থাকার পর বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে ডলফিনটি মারা যায়।
বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার বলেন, ডলফিন’টি স্পিনার জাতের। স্পিনার ডলফিনের দৈর্ঘ ৬-৭ ফুট এবং ওজনে ১৩০-১৭০ পাউন্ড বৃদ্ধি পায়। এদেরকে আটলান্টিক এবং ভারতীয় মহাসাগরে উষ্ণ গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং উপোযোগী জলের মধ্যে পাওয়া যায়। স্পিনার ডলফিন চার প্রজাতির হয়ে থাকে। কক্সবাজারে ভেসে আসা ডলফিনের দৈর্ঘ্য ছিল ৫ ফুট, ওজন ২৭ কেজি।

গবেষকরা ধারণা করছেন, ডলফিনটির বয়স আনুমানিক এক বছর এবং লম্বায় ৫ ফিট। শরীরের কয়েকটি জায়গায় আঘাতের চিহ্ন আছে।
ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটির (ডব্লিউবিসিএস) হিসাবে দেখা যায়, ২০০৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দুইশর মত সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মৃত্যুর রেকর্ড আছে বাংলাদেশের জলসীমায়, যার বেশিরভাগই ডলফিন। ডব্লিউবিসিএস প্রতি দুই বছর পর পর বাংলাদেশের সমুদ্র জরিপ চালায়। প্রথমবার ২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল। পরে ২০১৭-১৮ সালে। পরের জরিপের ফলাফল এখনও প্রকাশিত হয়নি।
সেইভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১২ মে কক্সবাজার টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের শফির বিল এলাকায় ১১ ফুট লম্বা একটি মৃত ডলফিন ভেসে আসে। আট দিনের ব্যবধানে ২০ মে কলাতলী পয়েন্টে সাগরে একটি মৃত ডলফিনকে ভাসতে দেখেন দুইজন লাইফ গার্ড। এর পরদিন ২১ মে লাবণী পয়েন্টে টিবি বুথের কাছে আরেকটি মৃত ডলফিন পাওয়া যায়। এর আগে একই বছরের ৪ এপ্রিল টেকনাফের শাপলাপুর সমুদ্র সৈকতে একটি ডলফিনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরদিন ইনানী সমুদ্র সৈকতের রয়েল টিউলিপ হোটেলের বিপরীতে সাগরে একটি মৃত ডলফিন ভাসতে দেখা যায়, যেটির আঘাতের চিহ্ন এবং লেজে দড়ি বাঁধা ছিল। ওই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি সেন্টমার্টিন উত্তর সৈকতের কবরস্থানের পাশে সাগর থেকে ভেসে আসা একটি মৃত ডলফিনকে মাটি চাপা দেওয়া হয়। একদিনের মাথায় ২৩ ফেব্রুয়ারি দ্বীপের জেটি ঘাটের দক্ষিণ পাশে মাটি চাপা দেওয়া হয় আরেকটি ডলফিন। মাত্র কয়েকঘন্টা’র ব্যবধানে ২৪ ফেব্রুয়ারি সেন্টমার্টিন পুলিশ ফাঁড়ির সামনে একটি মৃত ডলফিন ভেসে আসে। পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি সেন্টমার্টিন সৈকতের পশ্চিম পাড়ায় মৃত আরেকটি ডলফিনকে মাটি চাপা দেন বিচ কর্মী এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মীরা।
এছাড়া ২০২০ সালে ও ২০২১ সালের প্রথমে টেকনাফ এবং উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় আরও কয়েকটি ডলফিনের মৃতদেহ ভেসে আসে বলে জানা যায়। ওই সময় লকডাউনের কারণে সেসবের ছবি সংগ্রহ করতে পারেনি কেউই।
করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে ২০২০ সালের ২৩ মার্চ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্টের কাছে ডলফিনের দুটি দলকে খেলা করতে দেখেন স্থানীয়রা। দুটি দলে সেখানে মোট ২০-২৫টা ডলফিন ছিল। সেগুলো ইন্দো প্যাসিফিক হাম্পব্যাক বা গোলাপী ডলফিন ছিল বলে দেশের বিশেষজ্ঞরা সে সময় নিশ্চিত করেন। ওই দৃশ্য দেখে সমুদ্র উপকূলের পরিবেশ প্রতিবেশের উন্নতি ঘটেছে বলেও অনেকে আশা প্রকাশ করেন তখন। কিন্তু এপ্রিলের শুরু থেকেই থেকেই একের পর এক ডলফিন এবং ডলফিন গোত্রীয় পরপোয়েসের মৃতদেহ উপকূলে ভেসে আসতে থাকে। যদিও এত ডলফিনের মরদেহ ভেসে আসার খবরটি সঠিক নয় দাবি করে বন বিভাগের বন্যপ্রাণী এবং প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের সংরক্ষক মিহির কুমার দে বলছিলেন, সামাজিক মাধ্যমে এ তথ্য ‘ছড়ানো হচ্ছে’। তিনি শুধু দুটি ডলফিনের মরদেহ মারা গিয়েছে বলে দাবি করেছিলেন।
এর আগে ২০১৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দড়িয়ানগর প্যারাসেইলিং পয়েন্টে একটি ইন্দো প্যাসিফিক হাম্বব্যাক ডলফিনকে আহত অবস্থায় পাওয়া যায়। সেটিকে বাঁচাতে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছে সাহায্য চাওয়া হলেও পাওয়া যায়নি। পরে সেটি মারা গেলে বন বিভাগের লোকজন মাটিচাপা দেয়।
এদিকে মৃত তিমি ভেসে আসার সবশেষ ঘটনাটি ঘটে ২০২০ সালের ২২ জুন। একটি ব্রিডিস তিমির মরদেহ টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ সৈকতের গোলারচর পয়েন্টে ভেসে আসে। এর আগে ১৪ জুন কক্সবাজার উপকূলে আরেকটি জীবন্ত তিমি আটকা পরে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, সেটি রক্তাক্ত ছিল। পরে স্থানীয়রা সেটিকে ঠেলে সমুদ্রে নামিয়ে দেয়। এটিই সৈকতে ভেসে আসা সেই মৃত তিমি কিনা সেটি নিশ্চিত করতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। ২০২০ সালের জানুয়ারিতেও আরেকটি তিমির মৃতদেহ সেন্টমার্টিন দ্বীপ সংলগ্ন সমুদ্রে ভাসতে দেখা গিয়েছিল
ওই সময় পরিবেশবাদীর বলেছেন, সমুদ্র সৈকত এবং সংলগ্ন সাগর এলাকা লকডাউনের সময় কোলাহলহীন থাকায় ডলফিন, পরপয়েসের মত প্রাণী সৈকতের কাছাকাছি বিচরণ করছে। তাদের অধিকাংশের মৃত্যু ঘটছে মাছ ধরার জালে, জেলেদের অসচেতনতার কারণে।
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাসুম বিল্লাহ জানান, সাগরে ডলফিনের আনাগোনা ভালো একটা দিক। কিন্তু যেসব ডলফিন আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা যাচ্ছে সেগুলো ফিশিং বোট’র ইন্ঞ্চিন এবং জালের আঘাতে মারা যাচ্ছে।
পরিবেশবিদ ও সমুদ্র গবেষণা’র সাথে নিয়োজিতরা বলেন, ২০১৯ সালের আগে কখনো কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে ডলফিনের আনাগোনা তেমন দেখা যায়নি। যদিও দেখা গেলে তা গভীর সমুদ্রে। কিন্তু ২০২০ সালে একের পর এক মৃত ডলফিন ভেসে আসে। তাদের ধারণা, গত দুই বছরে ২০১৯ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত অন্তত ২০ টি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে। যেগুলো মানুষের চোখে পড়েছে সেগুলো রেকর্ড হয়েছে। কিন্তু রেকর্ডের বাইরেও আরও ডলফিন মারা যেতে পারে। অনেক ডলফিন মারা গিয়ে পঁচে গলে সাগরে মিশে গেছে। যেগুলো হয়তো মানুষের চোখে পড়েনি।

বণ্যপ্রাণী গবেষক নাদিম পারভেজ বলেন, অগভীর সমূদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে জেলেদের জালে আটকা পড়ে কিংবা ট্রলারের পাখায় আঘাত লেগে ডলফিন গুলো মারা যাচ্ছে। অধিকাংশ ডলফিনের গায়েই জালে আটকে পড়ার চিহ্ন ছিল।
কক্সবাজারের জেলা মৎস কর্মকর্তা মোঃ বদরুজ্জামানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দৈনিক কক্সবাজার’কে বলেন, ডলফিন খুবই শান্ত প্রকৃতির। ডলফিনের আনাগোনা মাছের সংখ্যা দ্বিগুণ হয় এবং সাগরের পরিবেশও ভালো থাকে। তিনি বলেন, সাগরে মাছ ধরা ট্রলারের পাখার আঘাতে ডলফিন মারা যেতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সারওয়ার আলম দৈনিক কক্সবাজার’কে বলেন, জেলেদের কারণে যদি এরকম কোন ঘটনা ঘটে তা প্রমান হলে তাদের বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, সাগরে মাছ ধরার জালে ডলফিন, কচ্ছপ, হাঙর, তিমি ধরা পড়লে পিটিয়ে হত্যা না করে ছেড়ে দিতে জেলেদের নির্দেশনা দেওয়া আছে। ডলফিনকে আঘাত করার কারণ থাকতে পারে না।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ অনুযায়ী তিমি বা ডলফিন হত্যার দায়ে কেউ অভিযুক্ত হলে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড অথবা তিন লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে। তিমি বা ডলফিনের দেহাবশেষ সংগ্রহ করলে তার জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের সাজা অথবা এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সকাল ১১ টার দিকে উখিয়ার পাটুয়ার টেক বাইলাখালী সমুদ্র সৈকতে জীবিত অবস্থায় স্থানীয়রা একটি ডলফিন দেখতে পায়। পরে সেটি মারা যায়। সুত্র: দৈনিক কক্সবাজার

পাঠকের মতামত

অতিরিক্ত বোঝাইয়ে দুর্ঘটনার শঙ্কা, বনভূমিতে বাঁশ মজুতের অভিযোগউখিয়ার সড়কে ফের বাঁশবোঝাই ট্রাকের দৌরাত্ম্য

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সড়কে আবারও অতিরিক্ত বাঁশবোঝাই ট্রাকের দৌরাত্ম্য বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব ট্রাকে নির্ধারিত ...

সীমান্ত নিরাপত্তায় পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটি হচ্ছে রামু সেনানিবাস

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও কৌশলগত সামরিক সক্ষমতা ...
Single Page Footer